রসরাজের আইডি দিয়ে উসকানির ফাঁদ?

রসরাজের আইডি দিয়ে উসকানির ফাঁদ?

Published:11 Nov 2016   09:38:02 PM   Friday   ||   Updated:12 Nov 2016   08:56:36 AM   Saturday
রসরাজের আইডি দিয়ে উসকানির ফাঁদ?
দেশআমার ডেস্ক : সম্প্রতি ইসলাম ধর্ম অবমাননা করে ফেসবুকে ছবি আপলোডের ঘটনায় নাসিরনগরে ঘটেছে সাম্প্রদায়িক হামলা। সেখানকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা রয়েছেন উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে। নাসিরনগরজুড়ে চাপা আতঙ্ক।

এ ঘটনার পর স্থানীয়রা যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন তা হলো- রসরাজ দাসের ফেসবুক আইডি অরক্ষিত ছিল কি না? এই ঘটনায় লাভ হলো কাদের? স্থানীয় রাজনীতির দ্বন্দ্বের বলি তারা কেন হলেন? নাসিরনগর ঘুরে  অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরো কিছু প্রশ্ন। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে প্রশাসন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনার নেপথ্যের নায়কেরা চিহ্নিত হলেই মিলবে সব প্রশ্নের উত্তর।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে সরাইল। সেখান থেকে হাওর ধরন্তির নৈসর্গিক সৌন্দর্য পেরিয়ে নাসিরনগর। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এলাকাজুড়ে সুনসান নীরবতা। উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন স্থানীয়রা। শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নয়, দীর্ঘ বছর ধরে মিলেমিশে বসবাস করা অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেও উৎকণ্ঠা দেখা গেল। তারা হামলার ক্ষত সারিয়ে সৌহার্দ্য সম্প্রীতিতে আগের মতো বাঁচার চেষ্টা করছেন। তাদের মনে একটাই প্রশ্ন- কেন এই হামলা? কেন-ই বা প্রশাসন ব্যর্থ হলো হামলা প্রতিরোধে?

হবিগঞ্জের মাধবপুর বাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় বাজারের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। মাধবপুর বাজার থেকে ইট বিছানো সড়কে এগোলেই তিতাস নদীর পাড়। সেখানে জেলেপাড়া। জেলেপাড়ার শেষ প্রান্তে রসরাজের ঘর। তিনি বালিঙ্গা বিল মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক। তার ফেসবুক আইডি থেকে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে ছবি পোস্ট করা হয়েছে- এমন অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এ কথার সত্যতা সেদিন যাচাই করার প্রয়োজনবোধ করেনি কেউ। ঘটনা বিচার-বিশ্লেষণ না করে হরিণবেড় বাজারে ছড়িয়ে পড়ে ধর্মীয় উন্মাদনা। রসরাজের প্রতিবেশীরা জানান, তারা তিন ভাই ও এক বোন। উত্তরাধিকার সূত্রে তারা জেলে। তার ঘরে কম্পিউটার বা ল্যাপটপ নেই। তবে রসরাজ একটি মোবাইল সেট ব্যবহার করতেন। সেটি দিয়ে তিনি ফেসবুক চালাতেন কি না, তা জানাতে পারেননি তার প্রতিবেশীরা।

অবমাননাকর ছবি আপলোডের অভিযোগে রসরাজ দাসকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন রসরাজ পুলিশকে জানিয়েছে, তার ফেসবুক আইডি থাকলেও তাতে প্রবেশের পাসওয়ার্ড তিনি নিজে জানেন না। এমনকি ফেসবুকে যখন ছবিটি আপলোড করা হয়, তখন তিনি বিলে মাছ ধরায় ব্যস্ত ছিলেন। নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি রেখে গিয়েছিলেন বাড়িতে। সূত্রটি আরো জানান, ফেসবুকে ছবি আপলোডের পর তা ডিলিট করা ও ক্ষমা চেয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ার কাজটি যে অন্য এক যুবক করেছেন, সেটিও নিশ্চিত হওয়া গেছে। উত্তেজনা প্রশমন করতে রসরাজের ভাই হৃদয়ের কাছ থেকে ওই মোবাইল ফোন নিয়ে আশুতোষ নামের এক যুবক ক্ষমাপ্রার্থনা করে এ স্ট্যাটাস দেন। ফেসবুকের পাসওয়ার্ড সেভ করা থাকায় তিনি রসরাজের অ্যাকাউন্টে সহজেই ঢুকতে সক্ষম হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, এ সময় রসরাজ গ্রেপ্তার হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ছিলেন।

রসরাজের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মিজান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘রিমান্ডে রসরাজ বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। আমরা এখনো তার বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হইনি। তবে রসরাজ স্যামসাংয়ের একটি অ্যানড্রয়েড সেট ব্যবহার করতেন।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডিবির ওসি মো. মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর পরই আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ছবি আপলোডের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। আমরা তার কাছ থেকে যে তথ্য পেয়েছি, তা যাচাই-বাছাই করছি।’

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফেসবুক ব্যবহার করতে যে মেইল আইডির প্রয়োজন হয়, তা রসরাজের নামেই খোলা আছে। আমরা এ বিষয়টি সবকিছু মাথায় রেখে তদন্ত করছি।’

ঘটনার পর থেকে রসরাজের বাড়িতে কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তারা কোথায় আছে- তাও কেউ জানে না। এ ব্যাপারে পুলিশের কাছেও তথ্য নেই। গত ৫ নভেম্বর রসরাজের বাড়িতে যায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের প্রতিনিধিদল। পরে শাহরিয়ার কবির সাংবাদিকদের জানান, রসরাজের ঘরে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ছবি রয়েছে। যিনি মুসলিম ক্রিকেটারের ছবি ঘরে সাঁটিয়ে রাখেন, তিনি কখনো এত সাম্প্রদায়িক আচরণ করতে পারেন না। তা ছাড়া, তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, রসরাজ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার। তাকে ফাঁসানো হয়েছে।
 Nasirnagor

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় নাসিরনগরের হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখির। তিনি বলেন, ‘রসরাজ পঞ্চম শ্রেণির গণ্ডি পেরুনো যুবক। তার পক্ষে এভাবে ছবি এডিট করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিল নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে একটি পক্ষ তাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। আমরা নিশ্চিত হয়েছি, রসরাজের ফেসবুক আইডি স্থানীয় আরো এক যুবক ব্যবহার করতেন।’

এ প্রসঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জানান, রসরাজের ফেসবুক টাইম লাইনে যে ছবিটি আপলোড করা হয়েছে, তা কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা এনড্রয়েড মোবাইল সেট ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর ফেসবুক খুলতে একটি মেইল আইডির প্রয়োজন হয়। মেইল আইডি খুলতে একটি মোবাইল নম্বরের প্রয়োজন। এখন খতিয়ে দেখতে হবে রসরাজের মেইল আইডিতে দেওয়া মোবাইল নম্বরটি তার, না অন্য কারো।

পুলিশের এজাহারে উল্লেখ আছে, ‘গত ২৮ অক্টোবর ফেসবুকে ছবিটি আপ করা হয়েছে। রাত সোয়া ৯টার দিকে ছবিটি স্থানীয় কয়েকজন দেখতে পান। তবে ২৯ অক্টোবর শনিবার ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে ছবির জন্য ক্ষমা চেয়ে একটি স্ট্যাটাস রসরাজের ফেসবুক আইডিতে পাওয়া যায়। এতে বলা হয়েছে, ‘প্রথমেই আমি সকল মুসলিম ভাইদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি, কারণ আমার অজান্তে কে বা কারা আমার আইডি থেকে একটা ছবি পোস্ট করেছে। কাল রাতে আমি মামুন ভাই, আশু ভাই আর বিপুলের মাধ্যমে জানতে পারি ছবি পোস্টের কথা। তার আগ পর্যন্ত আমি কিছুই জানতাম না। জেনে সাথে সাথেই ঢুকে ডিলিট করি। যেখানে আমরা বসবাস করি হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই হিসেবে, সেখানে ওই রকম মন-মানসিকতা এবং দুঃসাহস অবশ্যই আমার নাই। আমি কেন? আমি মনে করি ওই মনমানসিকতা কারো নাই, কারও থাকা উচিতও না। এ ছাড়া আমাদের মুসলিম ভাইয়েরা আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সার্বিক সহযোগিতা করে থাকেন। ওই খানে আমার আইডি থেকে এমন ছবি আমার অজান্তে কীভাবে পোস্ট হলো, কে বা কারা ওই কাজটা করল- আমি জানি না। তাই সকলের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’

রসরাজকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন বিভিন্ন উত্তর খুঁজছেন নাসিরনগরবাসী। তারা মনে করছেন- রসরাজ না, অন্য কেউ আপত্তিকর ছবি আপলোড করে সাম্প্রদায়িক হামলা চালানোর ফাঁদ পেতেছিলেন? এরা কারা? তদন্তের মাধ্যমে নেপথ্যের মানুষকে দ্রুত বের করতে হবে। হরিণবেড় এলাকার জেলেপল্লির বাসিন্দা আরতি রানী দাস (৪৫) বলেন, ‘ওই দিন যারা আমাদের বাড়ি-ঘরে হামলা চালিয়েছিল, তাদের আমরা আগে কোনোদিন এই গ্রামে দেখিনি। হামলাকারীদের আমরা চিনতে পারিনি।’

ঘটনা অনুসন্ধানে জানা যায়, রসরাজকে গ্রেপ্তার করার পর উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ফারুক আহমেদ। এমনকি তিনি তার ফেসবুক আইডিতে ধর্মীয় অবমাননার ব্যঙ্গচিত্রটি শেয়ার করে প্রতিবাদের ডাক দেন। যদিও ইতিমধ্যে জেলা আওয়ামী লীগ থেকে তিন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফারুক আহমেদ এই তালিকায় আছেন।

এ প্রসঙ্গে ফারুক আহমেদ  বলেন, ‘ঘটনার নেপথ্যে আমি না, অন্য কেউ জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করছে। আশা করছি, তদন্তেই বেরিয়ে আসবে কে আসল দোষী। আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করতেই একটি মহল এমন অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে নাসিরনগর উপজেলা ছাত্রলীগের প্রাক্তন সভাপতি আসাদুজ্জামান চৌধুরী  বলেন, ‘ফেসবুকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ছবি আপলোড করে যারা সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করেছেন, তাদের শিগগিরই আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে শুধু নাসিরনগরে নয়, বাংলাদেশের কোথাও কেউ এ ধরনের ঘটনা আর কোনো দিন ঘটাতে সাহস না করে।’

No comments: