হৃদয়ে সঙ্কট

স্টাফ রিপোর্টার
গোটা শরীরে রক্ত সরবরাহ করে হার্ট, শিশুও জানে সে কথা৷ রক্ত সরবরাহ মানে, কোষে কোষে পুষ্টি আর অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া৷ কিন্তু একটা কথা বিশেষ মাথায় রাখে না অনেকেই৷ সেটা হল, হার্ট নিজেও একটা অঙ্গ আর বেঁচে থাকার জন্য তার নিজেরও প্রয়োজন পুষ্টি, অক্সিজেন৷ তাই শরীরের যে কোনও অংশের মতো, নিরবিচ্ছিন্ন রক্ত সঞ্চালন হার্টের বেঁচে থাকার জন্য একান্ত জরুরি৷

হ্যাঁ, নিরন্তর৷ কেন না, রক্ত সঞ্চালনের ক্ষেত্রে আর পাঁচটা অঙ্গ সাময়িক (খুব স্বল্প সময় যদিও) বিরতি তবু সয়ে নিতে পারে৷ কিন্তু এত সহ্যশক্তি হার্টের নেই৷ কেন না, হৃদযন্ত্রে রক্ত সংবহণ সাময়িক বিঘ্নিত হওয়ার অর্থ-হৃদপেশি অকেজো হয়ে পড়া৷ নিট ফল, গোটা শরীরে রক্ত সংহবণ মুখ থুবড়ে পড়া৷ ডাক্তারি পরিভাষায়, মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন৷ মানে, হার্ট অ্যাটাক৷

তাই হৃদযন্ত্রের হাজারো রোগের মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল হল করোনারি হার্ট ডিজিজ৷ অর্থাত্‍, হৃদপেশিতে রক্ত সংবহণকারী করোনারি ধমনীতে ব্লকেজের কারণে হৃদপেশিতে রক্ত সংবহণ আংশিক বিঘ্নিত হয়ে যাওয়া৷ এ ছাড়াও অবশ্য হাজারো রোগ আছে হার্ট সংক্রান্ত৷ যেমন রিউম্যাটিক হার্ট ডিজিজ, হার্ট ভালভের নানা সমস্যা এবং হার্টে ইলেকট্রিক্যাল ইমপালসে বিঘ্ন ঘটাজনিত গোলমাল৷ কিন্ত্ত করোনারি হার্ট ডিজিজ-ই হচ্ছে সবচেয়ে কমন যার জেরে হৃদপেশিতে রক্ত সংবহণ বিঘ্নিত হয় (অর্থাত্‍, ইসকিমিক হার্ট ডিজিজ)৷ বুকে আচমকা ব্যথা (অ্যানজাইনা) হল এ রোগের সবচেয়ে কমন উপসর্গ৷

বস্তুত, হার্টের এই রোগটিই হচ্ছে পয়লা নম্বর ঘাতক৷ বিভিন্ন গবেষণার রিপোর্ট বলছে যে পাঁচটি অসুখের কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, তার মধ্যে একনম্বরেই রয়েছে করোনারি হার্ট ডিজিজ৷ গত চার দশকে এর প্রকোপ গ্রামাঞ্চলে দ্বিগুণ এবং শহরাঞ্চলে ছ'গুণ বেড়েছে৷ পরিণতি, এ দেশের গ্রামেগঞ্জের অন্তত ৫ কোটি এবং শহরে প্রায় ১৩ কোটি মানুষ এই সমস্যার শিকার৷ পরিসংখ্যান বলছে হার্টের অসুখে ভুগছেন, এ দেশে এমন মানুষের সংখ্যা গোটা দুনিয়ার এক-তৃতীয়াংশ যা আগামী দু' দশকের মধ্যে বেড়ে দাঁড়াবে দুই-তৃতীয়াংশে৷

এবং এ সবের মূলে রয়েছে তথাকথিত আধুনিক জীবনযাত্রা৷ লাইফস্টাইলের কারণেই যত বিপত্তি৷ আসুন, একঝলক দেখে নেওয়া যাক, জীবনযাত্রায় বদল এনে নিজের হৃদযন্ত্রটাকে একটু সুস্থ রাখা যায় কী ভাবে৷

সুস্থ হার্টের সাতকাহন

কায়িক পরিশ্রম: দিনভর 'অ্যাক্টিভ' থাকলে হার্টের ব্যামোর আশঙ্কা এমনিতেই কমে যায়৷ প্রতিদিন অন্তত আধঘণ্টা রীতিমতো ঘাম-ঝরানো কায়িক কাজকর্ম করতে হবে৷

ধূমপান ছাড়ুন: করোনারি হার্ট ডিজিজের আশঙ্কা বাড়ে যে সব কারণে, সেই তালিকার একেবারে উপরের দিকে রয়েছে ধূমপান৷ একজন অধূমপায়ীর চেয়ে একজন ধূমপায়ীর হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা চার গুণ বেশি৷ ধূমপান ছাড়ার পর একজনের হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা একজন ধূমপায়ীর তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায়৷

মদ্যপান সামলে: প্রত্যক্ষ ভাবে না-হলেও মদ্যপান পরোক্ষে করোনারি হার্ট ডিজিজের আশঙ্কা বাড়ায়৷ নিত্য মদ্যপানে বেশি ক্যালরি ঢোকে শরীরে৷ মেদসমৃদ্ধ শরীর যে হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম কারণ, তা কে না জানে!

ওজন আয়ত্তে রাখুন: ওবেসিটি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয় হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা৷ ভারতীয়দের গড় উচ্চতা যা, তাতে ৩৫ ইঞ্চির বেশি চওড়া কোমর হলে মুশকিল৷ জাঙ্কফুড এড়িয়ে সুষম খাবার খান যাতে প্রোটিন-ফ্যাট-কার্বোহাইড্রেটের ভারসাম্য রয়েছে৷

খাওয়াদাওয়া বুঝেশুনে: ফাইবার সমৃদ্ধ শাকসবজি খাওয়ায় জোর দিন৷ সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন মরসুমি সবজি ও মরুসুমি ফল খাওয়া নিশ্চিত করুন৷ প্রতিদিন ফল ও সবজি বদলে বদলে খেতে চেষ্টা করুন৷ মনে রাখবেন, দামি কোম্পানি রিফাইনড আটার চেয়ে সস্তার ভুসিযুক্ত (আসলে ফাইবার সমৃদ্ধ) আটা শরীরের জন্য ঢের বেশি উপকারী৷ প্যাকেটজাত দুধের ক্ষেত্রেই একই কথা প্রযোজ্য৷ মালাইযুক্ত দামি দুধের চেয়েও কম ফ্যাটের প্রোটিন সমৃদ্ধ ট্যালট্যালে সস্তার দুধ বেশি ভালো৷ প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময়েও লেবেলে ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট ইত্যাদির পরিমাণ দেখে নেওয়া উচিত৷
নুন কম: কাঁচা নুন খাওয়ার অভ্যাস না-থাকাই ভালো৷ উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তো কাঁচা নুন একেবারেই নয়৷ রান্না করা খাবারে নুনের পরিমাণ স্বাভাবিক থাকলে অবশ্য কোনও ক্ষতি নেই৷ প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময়ে দেখে নিন প্রতি ১০০ গ্রামে ১.৫ গ্রামের কম নুন বা ০.৬ গ্রামের কম সোডিয়াম আছে কিনা৷

মাছ-মাংস: রেড মিট (পাঁঠার মাংস) মাসে একবারে বেশি না-খাওয়াই মঙ্গল৷ চিকেন চলতে পারে৷ তবে সবচেয়ে ভালো মাছ৷ সপ্তাহে অন্তত দু' দিন মাছ ও মাছের তেল খেলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা কমে৷ ইলিশের মতো সামুদ্রিক মাছে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় তা শরীরে ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় যা আখেরে করোনারি হার্ট ডিজিজ ঠেকাতে সাহায্য করে৷ এইসময়

No comments: