ঈদ সেরা ইত্যাদি এবং হানিফ সংকেত

প্রতিবারের মতো এই হাজারও অনুষ্ঠানের ভিড়ে এবারও ‘ইত্যাদি’ই সেরার আসনটি দখল করে নিয়েছে। এবারও ঈদের ইত্যাদি শুরু হয় ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে... এই গানটি দিয়ে। যখন গানটি শুরু হয় তখন মনে হয় ঈদের আনন্দই নয় ঈদ যেন পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে আমাদের মাঝে হাজির হয়েছে। এবার প্রায় শতাধিক কাওয়ালি শিল্পীদের দিয়ে পরিবেশন করা হয়েছে গানটি। গত ঈদে ছিল শতাধিক বাউল শিল্পী। এর আগে ১৫টি হাতি নিয়ে আবার ৬টি বিভাগে কয়েক হাজার মানুষ নিয়ে ‘ইত্যাদি’তে ঈদের এ গানটি পরিবেশিত হয়েছে। এই যে বিশাল আয়োজন তা একমাত্র ইত্যাদির পক্ষেই সম্ভব। ঈদের বাজারে স্যাটায়ার ধর্মী যে রিপোর্টিং দেখানো হল তা আমাদের মধ্যবিত্ত আর নিুবিত্তের ঈদ আনন্দের প্রকৃত চিত্র। আমাদের ভেজালবিরোধী কার্যক্রম কখন যে শুরু হয় আর কখন যে শেষ হয় সেটা সাধারণ মানুষ জানতেই পারে না। কিন্তু ইত্যাদির তীক্ষ্ম বোধ সবসময়ই এ ভয়াবহ সমস্যা তুলে আনে আর সেটা এই ঈদের ইত্যাদির বিভিন্ন পর্বে চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। ইত্যাদির নাট্যাংশগুলোও বেশ চমৎকার ছিল। রান্নাবিষয়ক অনুষ্ঠানে মায়ের হাতের রান্না ফিরিয়ে আনা, ডিজিটাল মুদ্রাদোষ, ফেসবুকে সন্ধান লাভ, মিছিল ব্যবসা, ঈদে একটি বাড়িতে ঈদের দাওয়াত দিতে যাওয়ার বিড়ম্বনা নিয়ে নাট্যাংশ সবই ছিল উপভোগ্য এবং শিক্ষণীয়। সাত ভাই চম্পা গানটির পরিবেশন ছিল অত্যন্ত শিল্পরুচিবোধ সম্পন্ন ও সময়োপযোগী। সাত ভাই চম্পাকে জাগানোর জন্য পারুল বোন ডাকছে এবং সাত ভাই নানারকম কারণ দেখাচ্ছে কেন তারা জাগতে চাইছে না। পারুল বোন বলছে তার নিরাপত্তাহীনতার কথা, সম্ভ্রম রক্ষায় ভাইদের এগিয়ে আসার কথা। এসব ভাবনা এবং তার সার্থক পরিবেশনার জন্যই হানিফ সংকেত অদ্বিতীয়। সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া নারীদের সম্ভ্রমহানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদসরূপ সাত ভাই চম্পা গানটিতে যখন নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় দেশের মানুষকে জেগে উঠার কথা বলে তখন শরীরে কাটা দিয়ে ওঠে। একেই বলে উদ্দীপনা। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। আর এখানেই একটি অনুষ্ঠানের সার্থকতা। নানি-নাতি এবং মামা-ভাগ্নে পর্ব প্রতিবারের মতোই উপভোগ্য হয়েছে। মামা-ভাগ্নে পর্বে ফেসবুকের অপব্যবহারকারী আত্মপ্রচার লোভী মানুষদের চরিএ তুলে ধরে কটাক্ষ করা হয়েছে যা ছিল সময়োপযোগী। এবারের নৃত্য বা নাচের যে ব্যতিক্রমধর্মী উপস্থাপনা দেখানো হয়েছে তা অভূতপূর্ব। সঙ্গীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন এবং তার কন্যা বাঁধন এবং নৃত্যশিল্পী সাদিয়া ইসলাম মৌ এবং তার মেয়ে পুষ্পিতার সঙ্গীত এবং নৃত্য পরিবেশনা ছিল অসাধারণ, সেই সঙ্গে গানটির কথা এবং সুর চমৎকার। দর্শক পর্বও ছিল উপভোগ্য। দর্শক পর্বের প্রপস্ যা ব্যাংকের চেক সদৃশ্য বোর্ডের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে, আইডিয়াটা চমৎকার। ফেসবুক নিয়ে তারকাদের দিয়ে করা পর্বে যেসব বিষয় উঠে এসেছে তা ছিল সময়োপযোগী। ছেলের মা ছেলের জন্য বিবাহযোগ্যা কন্যা দেখতে এসে যে পরিস্থিতির শিকার হলেন সেটা যেন বর্তমান সময়ের জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি। চমৎকার অভিনয় করেছেন ডলি জহুর, মীর সাব্বির, নিমা রহমান, প্রাণ রায় এবং আরফান। ঈদের ইত্যাদির বিশেষ আকর্ষণ ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কর্মরত বিদেশী ও বিদেশীনীদের নিয়ে পর্ব। সামান্য একটি ছাগল হারানোর ঘটনাকে যেভাবে বিদেশীদের দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে তা ছিল এক কথায় অনবদ্য। সমাপনী গানটি চমৎকার ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশের একটি আন্তর্জাতিক ও মানবিক সমস্যা হাজার হাজার মানুষকে যেভাবে মানবেতর জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে, সেই সঙ্গে ব্যথিত করেছে আমাদের। সেই বিদেশ গমনেচ্ছু মানুষের কষ্ট আর প্রবাসীদের কান্নার শব্দ যেন শুনতে পেলাম প্রবাসীদের নিয়ে লেখা এবং এ্যান্ড্রু কিশোরের গাওয়া, আলী আকবর রূপুর সুর করা গানটিতে। গানটির চিত্রায়ন ছিল অসাধারণ। ইত্যাদি দেখতে বসে দর্শকরা প্রথমে যেমন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খান ঠিক তেমনই অনুষ্ঠানের শেষে এসে আবেগতাড়িত হন। চোখের কোণ বেয়ে ঝরে পড়ে অশ্রু। আর এখানেই হানিফ সংকেতের মুন্সিয়ানা, ইত্যাদির সার্থকতা।

No comments: