স্ট্রোকে সব চেয়ে দামি প্রথম কয়েক ঘণ্টাই

চিকিৎসার আদর্শ সময়, অর্থাৎ যে সময়ে হাসপাতালে পৌঁছলে রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, ইংরেজিতে তাকেই বলা হয় 'গোল্ডেন আওয়ার'। এতদিন পর্যন্ত জানা ছিল, দুর্ঘটনাজনিত আঘাত (ট্রমা) বা হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রেই এই গোল্ডেন আওয়ার-এর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন চিকিৎসকরা বলছেন, স্ট্রোকের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও গোল্ডেন আওয়ার রয়েছে। আর তা হলো প্রথম সাড়ে চার ঘণ্টা। স্ট্রোক হলে কোনোভাবেই একটা মুহূর্তও যাতে নষ্ট করা না হয়, যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে যেন নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে, সেটাকেই স্ট্রোকের সফল চিকিৎসার প্রাথমিক শর্ত বলে মনে করছেন তাঁরা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৃথিবীতে এখন প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। ২০০০ সালের পর থেকে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের ধনী দেশগুলির চেয়ে উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলিতেই স্ট্রোকের সংখ্যা বাড়ছে। খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস, ন্যূনতম শরীরচর্চাও না করা এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপকেই এর জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞেরা। তথ্য বলছে, পৃথিবীতে প্রতি বছর ৫৮ লাখ মানুষ স্ট্রোকে মারা যাচ্ছেন। এডস, যক্ষ্মা এবং ম্যালেরিয়া মিলিয়ে পৃথিবীতে যত মানুষ মারা যান, তার চেয়েও স্ট্রোকে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। প্রতি ৬ সেকেন্ডে একজন এর বলি হচ্ছেন। মৃত্যুর কারণ হিসেবে দ্বিতীয় এবং পঙ্গুত্বের কারণ হিসেবে চতুর্থ স্থানে রয়েছে এই অসুখ।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল এখন পৃথক স্ট্রোক ক্লিনিক খুলছে। হচ্ছে নানা সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানও। গত শনিবার এক জাতীয় স্তরের স্ট্রোক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল দুর্গাপুরের মিশন হাসপাতাল। কী ভাবে লড়াই করা যায় এই রোগের সঙ্গে, সে নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিশেষজ্ঞরা তাঁদের মতামত দেন। স্নায়ু রোগ চিকিৎসক প্রবীণ কুমার যাদব, দেবাশিস রায় প্রমুখের মতে, স্ট্রোকের চিকিৎসার ক্ষেত্রে তৎপরতা এবং প্রশিক্ষিত কর্মী থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিউরোলজিস্ট, নিউরো সার্জন, নিউরো সাইক্রিয়াটিস্ট-এর একটা পূর্ণাঙ্গ দল যেমন চাই, তেমনই চাই সমস্ত ধরনের পরীক্ষার ব্যবস্থাও, যাতে রোগী হাসপাতালে আসার পরে একটা মুহূর্তও বৃথা না যায়।
স্ট্রোক হয় কী ভাবে? চিকিত্‌সকেরা জানাচ্ছেন, সাধারণত দু’ভাবে। মস্তিষ্কে রক্ত জমে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়ে কিংবা মস্তিষ্কের রক্তনালী ফেটে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, রক্তনালী যদি ফেটে যায়, তা হলে এই গোল্ডেন আওয়ার-এর অস্তিত্ব থাকে না। কিন্তু যদি রক্তনালী বন্ধ হয়ে গিয়ে স্ট্রোক হয়, যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হয় ইস্কিমিক স্ট্রোক, তা হলে প্রথম সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে শিরার মধ্যে একটি ওষুধ দিতে হয়। একে বলে থ্রম্বোলাইসিস। স্নায়ু রোগ চিকিৎসক জয়ন্ত রায়ের কথায়, ‘‘হার্টে রক্ত চলাচলের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে তবু কিছু ক্ষণ লড়াইয়ের সুযোগ থাকে। কিন্তু মস্তিষ্ক বেশি ক্ষণ বাঁচতে পারে না। ইস্কিমিক স্ট্রোক হলে প্রতি সেকেন্ডে মস্তিষ্কের ৩২ হাজার কোষের মৃত্যু হতে থাকে। ফলে সময়টা এ ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘‘প্রথম দেড় থেকে দু’ঘণ্টার মধ্যে এই চিকিৎসা শুরু হলে সব চেয়ে ভাল ফল পাওয়া যায়। সাড়ে চার ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে ওষুধের কর্মক্ষমতা কমে যায়। তখন ক্যাথ ল্যাবে নিয়ে গিয়ে মস্তিষ্কে যেখানে রক্ত জমাট বেঁধেছে সেখানে মাইক্রোক্যাথিটার দিয়ে জমাট বাঁধা অংশকে গলিয়ে দেওয়া হয়। তাতেও কাজ না হলে মস্তিষ্কে স্টেন্ট পরানো হয়। আট ঘণ্টা পর্যন্ত স্টেন্ট থেরাপির সময় থাকে। আট ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে তখন আর কিছু করার থাকে না।’’
একই কথা বলেছেন স্নায়ু রোগ বিশেষজ্ঞ শ্যামল দাসও। তিনি জানান, চিকিৎসা শুরুর আগে রক্তের কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা এবং সিটি স্ক্যান করে নেওয়া জরুরি। রক্তচাপ এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকলে সেটাও কমাতে হবে। কিন্তু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে রোগীকে যেন ফেলে রাখা না হয়। দ্রুত ভর্তি করে যাবতীয় প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। দেরি হয়ে গেলে স্থায়ী ক্ষতি আটকানো যায় না।
প্রশ্ন হল, রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে ভর্তির নিয়মকানুন পালন, ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া এবং তার পরে ডাক্তার এসে যথাযথ চিকিৎসা শুরু হতে হতেই তো কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে বাড়ির লোক দেরি না করলেও চিকিৎসা শুরু হতে যে দেরি হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? স্নায়ু রোগ চিকিৎসক তৃষিত রায়ের স্বীকারোক্তি, ''এখানেই তো পিছিয়ে রয়েছে এই রাজ্য। বহু হাসপাতালেই যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। ডাক্তার-নার্সের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু স্ট্রোকের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সময় বাঁচানো কতটা জরুরি সেই বোধটাই অনেকের থাকে না। ফলে পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাঁচানো যায় না বহু রোগীকে।

No comments: